নেতিবাচক রাজনীতি ও বাঙালির আত্মহননের কাহিনী
Jan 15, 2026 - By Ashutosh Roy Politics
নেতিবাচক রাজনীতি (Negative Politics) বাঙালির রক্তে
বাঙালি প্রায় জন্ম থেকেই এমন একটা পরিবেশে গড়ে ওঠে, যার অতি গুরুত্বপূর্ণ সহগ নেতিবাচক রাজনীতি (negative politics)। আমরা যারা পঞ্চাশ বা ষাটের ঘরে আছি তারা ছোটবেলা থেকে কি শুনছি? চলছে না, চলবে না। চাক্কা বন্ধ। আবার যারা বর্তমানে কুড়ির ঘরে তারাও এই একই জিনিস দেখেই আসছে। চিরকালই আমরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী।
আমরা চিরকালই বিশ্বাস করে এসেছি হেনরি ডেভিড থোরিয়াউকে, যিনি বলেছিলেন “অবাধ্যতাই স্বাধীনতার প্রকৃত ভিত্তি। অনুগতরা দাস হবেই”।
বেপরোয়া বাঙালি ও নেতিবাচক রাজনীতি
বাঙালি বেপরোয়া। এই বেপরোয়া মনোভাব এক দিকে বিনয় বাদল দীনেশকে স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানে একটুও বাধা দেয় নি। ঠিক উল্টোদিকে দেখুন বর্তমানে বাঙালি তোলাবাজিতেও বেপরোয়া। আজকে তার পয়সা তুলতে বা ঘুষ চাইতে সে এতটুকু সংকুচিত হয় না।
আমরা প্ৰতিষ্ঠান বা আইনকে গুরুত্ব দিই না। ক্ষুদিরাম যেরকম আইন ভেঙ্গে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন, আজ শাজাহানও ধরা পড়ার পরে একইরকম রোযাবে আঙ্গুল ঘোরাতে ঘোরাতে চলে। কেউ বলবেন না, কার সাথে কার তুলনা। একজন দেশবরেণ্য আরেকজন দেশের ত্রাস। কিন্তু দুটোই এই বেপরোয়া মনোভাবের ফসল।

বাঙালির বিদ্রোহীসত্তা
ছোটবেলায় শুনেছি ট্রাম ভাড়া এক পয়সা বাড়ানোর জন্য কলকাতায় ট্রাম জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছিল। জানি না, সেদিন কোন ইউনিয়িনের নেতা সরকারের সাথে এই ভাড়া বাড়ানোর কারণ নিয়ে আলোচনা করেছিল কি না। সেটা বোধ হয় বাঙালির অতি সাধের আত্মমর্যাদাবোধে বাধে।
আর আজ বিদ্যুৎ বিল নিঃসাড়ে বেড়ে গেলেও বাঙালি কোন প্রতিবাদ করে না।
আজ আর বব মারলির মতো কেউ বলার নেই, “জাগো,রুখে দাঁড়াও,নিজের অধিকারের জন্য লড়ো। জাগো,রুখে দাঁড়াও,লড়াই ছেড়ো না”। এমনকি এক দিক থেকে দেখতে গেলে নক্সাল আন্দোলনের মূলেও ওই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা এবং কৃষকের ক্ষমতায়ন। আমরা তার গূঢ় আলোচনা এখানে করছি না।
বাঙালির অধিকারবোধ ও আত্মমর্যাদাবোধ
আশির দশকে আমরা দেখলাম বাঙালির এই হটকারী রাজনীতি কিভাবে বাঙালির শিল্পোদ্যান শশানের দিকে নিয়ে গেল। যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল ফ্রেট নীতি অনেকটা দায়ী। কিন্তু মালিকপক্ষের সাথে আলোচনার বদলে আমরা কেবল আমাদের অধিকারের লড়াই চালিয়ে গেলাম।
বুঝতেও চেষ্টা করলাম না, যে শ্রেণী সংগ্রামের লড়াইটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যে পরিবর্তনের হাওয়া উঠছে, আমরা বন্ধ মনের দরজা দরজা জানলা খুলে দিয়ে সেটা বুঝতেই পারলাম না।
যেখানে আলোচনা করলে হয়তো উভয়পক্ষের পক্ষে হিতকর কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত, আমরা রাজনীতির রংয়ে আর পুঁজিবাদী নিপাতযাক ঢঙ্গে জঙ্গি আন্দোলনে মত্ত হলাম। একটা সময় ছিল যে বনধ একটা বাৎসরিক উৎসবে পরিণত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে উপস্থিতি ঠিক রাখতে অফিসেই নৈশযাপনের অভ্যাস শুরু হল।
নেতিবাচক রাজনীতি এবং কেন্দ্রের বিরোধিতা
জ্যোতি বসু হামেশাই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, কিন্তু তিনি অন্তত কোন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাধা দেন নি। তার আমলেই মেট্রো রেল শুরু হয়েছিল। বা কোন বৃহৎ অসহযোগিতার অভিযোগও শোনা যেত না। বক্রেশ্বর নিয়েও কোন সমস্যা হয় নি।
আর এখন মেট্রো রেল সম্প্রসারণের জন্য চিংড়িঘাটায় সপ্তাহে তিনদিন রাতে কাজ করার জন্যও কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে দেখেন, প্রচারের আলোয় কে থাকবেন। যদি দেখেন তিনি নেই, তবে তিনি তাতে বাধা সৃষ্টি করেন। মেট্রো রেলের কাজে বাধার কারণ সেটাও হতে পারে। এখন সম্পর্ক এমন যে প্রধানমন্ত্রী এলে মুখ্যমন্ত্রী সেটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন।
অন্তত জ্যোতিবাবুকে অনেকবার ইন্দিরা গান্ধী, প্রণব মুখার্জী বা বরকত গনি খান চৌধুরীর মঞ্চ ভাগ করে নেবার ছবি আমরা দেখেছি। কেন্দ্রের বিরোধিতা উচ্চগ্রামে নিয়ে গেলেও জ্যোতি বাবু অন্তত বাঙালির উপকারে কোন প্রকল্প বনধ রাখেন নি।
এখন একশো দিনের কাজ থেকে কেন্দ্রীয় আবাস যোজনা থেকে আয়ুষ্মান ভারতের পর্যন্ত পশ্চিম বঙ্গে প্রবেশ নিষেধ।
এমনকি মালদায় যে বিএসএফ ক্যাম্প করার কথা ছিল, সেটাও হল না। রেল সম্প্রসারণ বা মেট্রো রেলের কাজের জন্য বা সীমান্তে বেড়া দেবার জন্যও জমি পাওয়া যায় না। অটলবিহারী বাজপেয়ী যে স্বর্ণালী চতুর্ভুজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, রাজ্যে এসে সেটা আটকে যায় ওই নিগুঢ় জমিনীতিতে।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পায়ন কেন ব্যর্থ হল?
বামজমানার শেষের দিকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিছু চেষ্টা করেছিলেন। তিনিও একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, আমি এমন একটা দল করি, যে দল বন্ধ ডাকে। তিনি বোধ হয় এই অন্ধ কেন্দ্র বিরোধিতায় দাড়ি টানার একটা চেষ্টা করেছিলেন। যদিও এব্যাপারে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন একসময়। অনেকেই তাকে ঠাট্টা করে “মৌ দাদা” নামকরণ করেছিল।
বুদ্ধদেব ভাট্টাচার্য অন্তত শিল্পবান্ধব একটা বার্তা দিতে পেরেছিলেন। একবার বিধানসভায় সৌগত রায়কে বলেছিলেন, আপনি পুঁজি নিয়ে আসুন, আপনাকেও স্বাদর আমন্ত্রণ। ওটাই বোধ হয় একমাত্র সময় যখন বাঙালি ইতিবাচক রাজনীতিতে সচেষ্ট হয়েছিল। এমনকি কট্টর বিরোধী বিজেপির মন্ত্রীরদের সাথে কথা বলতেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কখনো দ্বিধাবোধ করেন নি।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিছু সাফল্য পেলেও দলের ভিতরের দ্বন্দ্ব, দুর্বৃত্তায়ন আর তার কিছুটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা তাকে অগ্রণী হতে দেয় নি। সিঙ্গুরে যেখানে কঠোর হবার প্রয়োজন ছিল, সেখানে তার প্রশাসন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই কর্মনাশা অবরোধ চলতে দিলেন।
আর নন্দীগ্রামে, যেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেত, সেখানে তার অজ্ঞাতে তারই পুলিশ বাহিনী নির্মম অত্যাচার চালাল। যদিও বাস্তব এটাই যে তিনি গুলী চালানোর কথা জানতেনই না। এবং সেই সময়কার রাইটার্স কভার করা সাংবাদিকদের মুখে প্রকাশ তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত্য ক্রূদ্ধ এবং তিনি নন্দীগ্রামের ওসিকে ফোনে ধরতে চেয়েছিলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতিবাচক রাজনীতি
এই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান, তাও কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, বলা ভাল নিখাদ সিপিএম বিরোধিতার ফল। একবার স্মরণ করে দেখুন, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে কোন উত্তঙ্গ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মমতা। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নিশ্চয় কোন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন ছিল না।
এ ছাড়াও যে কোন ঘটনাকে রাজপথে টেনে এনে, মিডিয়ার ফোকাসে আনার ক্ষমতায় মমতার জুড়ি মেলা ভার।
যে মমতা শাসক হয়ে বনধকে বন্ধ করে দিয়েছে, সেই মমতা কি হারে বনধ ডেকে গেছে দীর্ঘদিন ধরে। কংগ্রেসকে ভাঙতে মমতা প্রায় চোখের বদলে চোখের রাজনীতি করেছেন। মমতা বিরোধী নেত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন ওই বন্ধ, মিছিল, মিটিং করে, প্রায় কলকাতা অচল করে দিয়ে। সেই মমতা আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বিরোধীদের মিটিং মিছিল পর্যন্ত করতে দেন না।
তার পুলিশের লাঠির ঘায়ে আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন আজকের বিরোধীরা।
জনতুষ্টিবাদ না উন্নয়ন?
আজ এই তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় বাংলার কি হাল সে কথা আর না বলাই ভাল। এই সরকার ত্রাণের সরকার। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন না কোন ভাতা। আয় বাড়ানোর জন্য একমাত্র ভরসা মদের দোকান। জনপ্রিয় থাকবার জন্য কোথাও কোন ট্যাক্স বাড়ে না।
এমনকি পার্কিং জোনে ভাড়া বাড়াতে গিয়ে কলকাতা পৌরসভার মেয়র এবং মুখ্যমন্ত্রীর অতি কাছের মানুষ ফিরহাদ হাকিমের যা শিক্ষা হয়েছে, তার পর আর কেউ কোথাও কোন ট্যাক্স বারবার সাহস দেখাবে?
যদি আমরা ত্রাণের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে পরিত্রানের দিকে যেতে চাই, সেটা নিশ্চয় ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে বোঝা যাবে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চুরি এবং দুর্নীতি।
বাংলায় অন্তত মন্ত্রী বা উচমাপের নেতাদের ঘাড়ে এইধরণের দুর্নীতির অপবাদ আগে কোনদিন চাপে নি।

পশ্চিম বঙ্গের রাজীনীতিতে মমতা বন্দোপাধ্যায় বোধ হয় প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যার বা যার পরিবারের বিরুদ্ধে এইরকম দুর্নীতির অভিযোগ উঠলো।
জ্যোতি বসুর ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তিনি বা তার পরিবার এইরকম কেন্দ্রীয় সংস্থার মুখোমুখি হন নি এবং কখনও।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একবার পরিহাসচলে এক সাংবাদিককে বলেছিলেন আমার কোন চন্দন নেই, আমার নন্দন আছে।
নৈতিকতার অবমূল্যায়ন?
পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলন এবং জরুরি অবস্থা পালনের জন্য সবচেয়ে ধকৃত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত শঙ্কর রায়ও তারই মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। এখানেই আসে নীতি নৈতিকতার প্রশ্ন। সততার প্রশ্ন।
বর্তমান অবস্থা এতোটাই গুরুতর যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে ইডির অভিযান চলার সময় ছিনিয়ে আনতে হয় ফাইল থেকে হার্ড ডিস্ক, মোবাইল।
সেটাও আবার একটা প্রাইভেট সংস্থার মালিকের বাড়ি থেকে। আইপিএস অফিসারেরা ফাইল বার করে তৃণমূলের গাড়িতে তোলেন।
আর পরিযায়ী শ্রমিক বা কর্মশ্রী প্রকল্প বা শিল্পায়ন – এই কথাগুলো আলোচনায় আপাতত না আনাই ভাল। খালি একটা কথা বলে আপাতত শেষ করি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোন চিন্তার কারণ নেই, কারণ যুবসমাজের একটা বড় অংশই আজ লেখাপড়ার বা কাজের সূত্রে রাজ্যের বাইরে। নইলে হয়তো কার্ট কোবেইন বলে উঠতেন, “যুব সমাজের কর্তব্য হলো দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ করা”।
বাঙালি যেন ভুলে না যায় যে আইনস্টাইন বলেছিলেন, “যদি আমি চুপ থাকি, তাহলে আমি জড়িত থাকার জন্য দোষী হব”।
Key Takeaways
- Negative politics has been ingrained in the blood of Bengalis for a long time.
- Bengalis, known for their strong sense of rights and self-respect, are by nature inclined to oppose the Centre.
- However, due to blind opposition, almost all central government projects in West Bengal are now stalled; even land acquisition for national security, railways, or roads has become a serious problem.
- The fearless Bengali who once, during the freedom struggle, became a source of national pride by sacrificing countless lives has today become adept at extortion.
- Bengali politics, once at the pinnacle of morality and integrity, is now deeply submerged in theft and corruption.
[…]নেতিবাচক রাজনীতি ও বাঙালির আত্মহননের কাহিনী নেতিবাচক রাজনীতি (negative politics) আত্মমর্যাদাপূর্ন বাঙালির অস্থি মজ্জায় এবং তা বাঙালির আত্মহননের কাহিনী হিসেবেই ইতিহাসে থাকবে – পড়ুন একটি গভীর বিশ্লেষণ।[…]